Saturday, October 12, 2019

গাঁজা সেবনে চাকরি দেবে নাসা, বেতন ১৪ লাখ!

এমন কোনো সংস্থা আছে যে, শুয়ে শুয়ে গাঁজা সেবনের জন্য চাকরি দেবে? তাদের বেতন আবার লাখের উপরে! বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। সম্প্রতি এমন এক চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নাসা এমন মানুষ খুঁজছে ‌যারা টানা ৭০ দিন গাঁজা টানতে টানতে শুয়ে থাকতে রাজি। তবে তাদের এই সময়টুকুর জন্য দেয়া হবে, ১৮ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় সোয়া ১৪ লাখ টাকা। ‌

তবে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে, স্কাইপে ভিডিও চ্যাট করতে বা গেম খেলতে পারবেন ওই ব্যক্তি। তার সঙ্গে লাগাতার টানতে হবে বিভিন্ন প্রকার গাঁজা।
নাসা আরো জানাচ্ছে, দীর্ঘ মহাকাশ‌যাত্রায় মানুষের দেহে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা জানতে চায় তারা। সঙ্গে সেই সময় গাঁজার কী ভূমিকা হতে পারে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে পৃথিবী থেকে মঙ্গলগ্রহে কোনো ‌যান পাঠাতে ৯ মাস সময় লাগে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, নাসার এমন গবেষণা মঙ্গল অভি‌যানের প্রস্তুতি।
সূত্র- ওয়েবসাইট
ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই

Sunday, October 6, 2019

সিদ্ধি বা ভাং

সিদ্ধি বা ভাং


শিশ, চরস, গাঁজা, সজ্জা, সিদ্ধি বা ভাং হচ্ছে একই গাছের রকমারি উৎপাদন, যার বৈজ্ঞানিক নাম Cannabis sativa, এক ধরনের শণ বা hemp গাছ। এই গাছের শুকনাে পাতা হচ্ছে সিদ্ধি, সাধারণত বেটে এমনি বা অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে খাওয়া হয়। উত্তর ভারতে, বিশেষত উত্তর প্রদেশে ভাঙের নেশার ব্যাপক প্রচলন প্রায় স্মরণাতীত কাল থেকে, যেজন্য এর বহু বৈচিত্র্য সম্ভব হয়েছে। সিদ্ধি সাধারণ ভােজ্যের সঙ্গে মেশানাে হয় যেমন, সিদ্ধির বরফি, কচুরি, সিঙাড়া, জিলিপি ও কুলপি। এ ছাড়া দই, গােলমরিচ, শসার বিচি ইত্যাদি বকাল’ সহযােগে শরবত, যার নাম ঠাণ্ডাই’, প্রখর গ্রীষ্মে শরীর সুশীতলকারক সিদ্ধির ধর্মীয় তাৎপর্ষ আছে সকলেই জানেন, শিবের পুজো সিদ্ধি গাঁজা ছাড়া হয় না, বিশেষ করে দ্বিতীয়টি। শুভ অনুষ্ঠান ভােজবাড়ি ক্রিয়াকর্মের ফর্দে প্রথমেই লেখা হয় “সিদ্ধি এত মূল্যের, বিজয়ার দিন সারা বছর কর্মসিদ্ধি আকাঙ্খা করে এক চুমুক খেতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু হিন্দু ধর্মের বিবিধ আখড়ায় এর অনেক গুরুত্ব। বহুকাল থেকে মঠ আখড়া প্রভৃতিতে শরীরচর্চার রেওয়াজ প্রচলিত, প্রভূত ডনবৈঠক কুস্তি তৎসহ ভাঙ। এর সঙ্গে দুধ ঘি মিষ্টির অনুপান পড়ায় বপুত্থান হতে দেখবার মতাে। এই রীতি গােটা উত্তর প্রদেশ, বিহারের নানা আখড়া থেকে পুরীর পাণ্ডাদের মধ্যে এখনও চালু। ভােজনের পরিমাণও দেখবার মতাে। ভাঙ ক্ষুধাবর্ধক, কিশােরীচাদ মিত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনীকার, তিনি লিখেছেন ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ উত্তর ভারত ভ্রমণে গিয়ে বৃন্দাবনে “. . দশ হাজার টাকা ব্যয় করে চেীবেদের একটি ভােজ দিলেন। চেীবেরা ছিলেন উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ, বৃন্দাবনের মন্দিরে তারাই পাণ্ডা-পুরােহিত। ... চৌবেরা ভােজনবীর বলে এখনাে বিখ্যাত। তারা নিজেদের লেটা ভরে ভাঙ এনেছিলেন এবং ভােজনের পূর্বে ক্ষুধা বাড়িয়ে নেবার জন্য ভাঙ খেয়েছিলেন প্রচুর, ফলে তারা প্রত্যেকেই তিন-চার সেরের মতাে পুরী ও মেঠাই পরম তৃপ্তিতে গলাধঃকরণ করেছিলেন।" কুস্তিতে দৈহিক ওজনের প্রয়ােজন ও গুরুত্ব যথেষ্ট, পালােয়ানদের মধ্যে ভাঙ খাওয়ার চলও বােধ হয় এর থেকেই। উনিশ শতকে কলকাতায় যে সব পড়ে, দুবে, চৌবে, তেওয়ারিরা আসতাে ধনীগৃহের দ্বারপাল নচেৎ পুলিসে চাকরির আশায়, কুন্তি আর ভাঙ তাদের নিত্যকার ব্যাপার। সিদ্ধি বাটা সময় ও পরিশ্রম সাপেক্ষ, উত্তর ভারতের অনেক বনেদি হিন্দু বাড়িতে সিন্ধি বাটার পৃথক বৃহদাকার শিল থাকে, চাকরও। হামানদিস্তাতেও অনেক জায়গায় কোটা হয়। বাটার মান সম্পর্কে প্রচলিত কহাবৎ আছে বাটতে বাটতে যখন এত চিটচিটে আঠা হয়ে যাবে যে নােড়া ধরে টানলে শিল উঠে আসবে, তখন বােঝা যাবে ঠিক পেষাই হয়েছে। উত্তর ভারতের বেশ কিছু ব্রাহ্মণ বাড়িতে একই কাজের জন্য বিশালাকার খল-নুড়ি ব্যবহার হয়ে থাকে। বাঙলায় বাটা' বললেও হিন্দিতে ভাঙ সর্বত্র ‘ধূটনা’- পিষনা’ নয়। ঘুটনা' শব্দটার ইঙ্গিতই যথেষ্ট যে তৈরির আদি প্রথা শিলনােড়ায় না হয়ে খল-নুড়ি বা হামানদিস্তা দ্বারা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সিদ্ধির দ্বিতীয় বৈচিত্র ‘মাজম' বা মাম’, যার উল্লেখ বাবুর ফর্পে আছে। শব্দটি এসেছে আরবি 'মা'জুন থেকে, আক্ষরিক অর্থ চটকে মাখা পদার্থ। মূল উপাদান ভাং, তার সঙ্গে দুধ, ঘি, সুগন্ধি মশলা আর চিনি দিয়ে বানানাে এক প্রকার মাদক মিঠাই। কলকাতার বড়বাজারে সিদ্ধির শরবতের দোকানে এখনও বিক্রি হয়। সেকালের খবর অনুযায়ী দাক্ষিণাতেও এর চলন ছিল। সিদ্ধির তৃতীয় বৈচিত্র ‘চুল'। মাসুম যেমন চটচটে সন্দেশাকুতি, চুরণ হচ্ছে গুড়াে মশলার মতাে। শুকননা সিদ্ধি পাতা, সুগন্ধি মশলা, চিনি সহ হামানদিস্তায় গুড়াে করে শেষে ঘি মেশানাে হয়। বিলাসী ধনীদের জন্য তৈরি হয় জাফরান মিশ্রিত চুরণ, চিমটিভের মুখে দিলেই নাকি শীত পালায়। চুরণের খদ্দের সীমাবদ্ধ, তারা খানদানী শৌখিন রঈস, একতাল গােবরের মতাে সিদ্ধি-বাটা-খেকোদের কিঞ্চিৎ নিচু চোখে দেখে থাকেন। সিদ্ধির নেশা অপেক্ষাকৃত পাতলা হয় বলে এর সঙ্গে বিবিধ বস্তু মেশাবার প্রথা আছে। সবচাইতে মারাত্মক ধুতরাের বীজ, মাত্রার হেরফের উম্মত্ব থেকে মৃত্যু, সবই ঘটতে পারে। দীনবন্ধু মিত্রের যমালয়ে জীবন্ত মানুষ'-এ আছে শিব একদিন সিদ্ধি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, নন্দী নূতন বাজারে গাঁজা কিনিতে আসিয়া শুনিয়াছিলেন, ক্লান্তীতে নেসা না হইলে মরফিয়া মিশাইয়া দিতে হয় এবং সিদ্ধিতে নেসা না হইলে ঝুল মিশাইয়া দিতে হয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর নাম ‘সিনারজিস্টিক এফেক্ট', চট করে নেশা হওয়ার জন্য আরও মেশানাে হয় তামার পয়সা ঘষে রুপার অক্সাইড, নারকেল গাছের শিকড় বাটা, তাড়ির গাদ প্রভৃতি। সিদ্ধির অনুপান মিষ্টি। সিন্ধি খাওয়ার পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করে, খেলে নেশাটাও বেশ জমে। নেশার অনুপান বা চাট অতিশয় গুরুতর বিষয়, এদিক ওদিক হলেই নেশাটি মাটি। পুনরায় দীনবন্ধু। সধবার একাদশীতে মাতাল নিমাকে ধরে পেটাচ্ছে রামধন, রেগে বলছে ‘এখন তােমাকে সন্দেশ কিনে দিই'। নিমাদের হাজির জবাব, 'কেন বাবা জিনিসগুলাে নষ্ট করবে? —মদের মুখে কোন শালা সন্দেশ খেতে পারে না।' হক কথা! মদের চাট হিসাবে প্রশস্ত হচ্ছে পেয়াজ-রসূনলঙ্ক যুক্ত আমিষ, নিদেন নােনতা ভাজাভুজি। মিষ্টি হার্গিশ না। সিদ্ধি ঠিক উলটো, মিষ্টি তৎসহ সাত্তিক শাকাহারী ভােজন। পেঁয়াজ-রসুন কি আমিষের গন্ধ নাকে গেলেই বমি আসবে। সব নেশারই নিজস্ব মেজাজ আছে, কোনােটা উদ্দীপিত করে, কোনােটা ঝিমিয়ে দেয়, যেমন মদ ক্রোধ ও হিংসাত্মক প্রবণতা বাড়ায় অনুপানের চরিত্রের সঙ্গে এই মেজাজের। সাদৃশ্য চোখে পড়ার মতাে। সিদ্ধি সেবনে মানসিক আনন্দ, সময় ও স্থানজ্ঞান লােপের সঙ্গে আসে কথা বলার প্রবণতা, বিশেষত অতীন্দ্রিয়, আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলার। এমন নেশার অনুপান সাত্ত্বিক ভােজ্য ছাড়া আর কি হতে পারে? তবে ব্যতিক্রম আছে এবং ইতিহাসে তার প্রমাণও পাওয়া যায়। মধ্যযুগ থেকেই ভারতীয় সৈনারা বিশেষত উত্তর ভারতীয়রা ভাং ও আফিম খেতাে। যুদ্ধের সময় তার পরিমাণ বাড়তাে। আফিমের প্রচলন ছিল বিশেষ করে রাজস্থান ও সন্নিহিত অঞ্চলে, কঁাচা আফিম জলে গুলে বানানাে পানীয়, যার নাম ইমল' বা ইমলি'। প্রতি সন্ধ্যায় আসর বসতো, গ্রামের মােড়ল প্রত্যেক পুরুষ গ্রামবাসীকে তার ‘ডােজ' অনুযায়ী ইমল বেঁটে দেওয়ার সম্মানিত দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তার জন্য হতে শুরুয়া অনুষ্ঠান। রামকৃষ্ণ পরমহংস ধর্মীয় আলােচনা প্রসঙ্গে একটি প্রবাদ বলেছেন, গৃহী হােকে বাতায় জ্ঞান, ইমলি পিকে করে ধ্যান/যােগী হােকে ঠোকে ভগ, এ তিন আদমী কলি কা ঠগ। অর্থাৎ সংসারী, গৃহী হয়ে যে ব্যাক্তি ধর্ম-সাধনা তথা বৈরাগের উপদেশ দেয়, যে আফিম খেয়ে বুদ হয়ে ধ্যান করার ভান করে ও যে যােগী হয়ে নারী সংসর্গ করে, এই তিন ব্যক্তি কলিকালের ঠক বা প্রতারক।সেই ইমলি! মুঘল যুগের বহু যুদ্ধের বিবরণে আছে পর্যদস্ত যােদ্ধারা মরিয়া লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়ার আগে সকলে রণক্ষেত্রেই ইমলির শেষ চুমুক খেয়ে নিচ্ছে। সৈন্যদের যুদ্ধে উদ্দীপ্ত করানাের জন্য নেশার প্রচলন সেই কবে থেকেই। ভারতে তা ছিল রকমারি যথা মদ, আফিম ও ভাঙ ব্রিটিশরা ভারতীয় বাহিনীতে সেই প্রথা পালটে মদের মনােপলির সৃষ্টি করে। নিম্নবর্গের সৈনাদের মধ্যে দেশীয়সের জন্য আরক ও শ্বেতাঙ্গদের জন্য রাম'। প্রথা পালটানাে সহজ নয়, অন্তত বেশ কিছু দিন সময় লাগে। কতদিন পর্যন্ত ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে আফিম ভাঙের চলন ছিল তার কতকগুলি পরােক্ষ প্রমাণ আছে। আফিম কেন খায়, সেই প্রশ্নের উত্তরে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সদস্য দীন মুহম্মদ (১৭৫৯-১৮৫১ খ্রি.) জানাচ্ছেন, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত শ্রেণীর লােক আফিমের নেশা করে। তাদের মধ্যে নিম্নবর্গের লােকেরা করে কঠিন, বিপজ্জনক কাজ করার সময়, বিপদ সম্পর্কে বােধশূন্য হওয়ার জন্য, উচ্চবর্গের লােকেরা করে বাসনা চরিতার্থ করতে, বিলাসিতার জন্য। ১৮৫৭ খ্রি. ব্যারাকপুরের সেনাছাউনিতে সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে দেশীয় সিপাহিদের ইংরাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে বলে, এক ইংৰাজ অফিসারকে জখম করে দেশব্যাপী সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা করে। কোর্ট মার্শালের সময় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আর এক সিপাহীকে বিচারপতির প্রশ্ন ছিল, পাণ্ডেকে নিবৃত্ত করলে না কেন? সে উত্তরে বলে, মঙ্গল ভাঙ থেয়ে উন্মত্ত হয়েছিল, তাকে ঠেকানাে যেত না।

বই: চিত্রিত পদ্মে
লেখক : অরুণ নাগ
চ্যাপ্টার: সেকালের নেশা

Tuesday, October 1, 2019

লালনের মানবধর্ম ও রবীন্দ্র মানসে লালনের প্রভাব

পলাশী যুদ্ধের সতের বছর পর বাংলার এক ক্রান্তিকালে লালনের জন্ম। এর মাত্র নয় বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করেছে। লালনের দীর্ঘ জীবন ব্রিটিশ শাসনের গুরুত্বপূর্ণ সময়কে স্পর্শ করেছে। এই সময়কালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, বাবু সংস্কৃতির জনক ও পৃষ্ঠপোষক নতুন সামন্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ হয়েছে- ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের সংগ্রাম, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ প্রভৃতি সংগ্রাম উপমহাদেশ দেখেছে।
এই সময়ের মধ্যে হিন্দুমেলা, জাতীয় কংগ্রেস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতা হিন্দু কলেজ, বেথুন কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, এশিয়াটিক সোসাইটি ইত্যাদি। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে বাঙালির সমাজ, সাহিত্য ও ধর্মীয় জীবনে এসেছেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, মধুসূদন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ। প্রকৃতপক্ষে ঊনবিংশ শতাব্দীর নানা কর্মকাণ্ডে বাঙালির জীবন স্পন্দিত। তবে জরুরি বিষয় হলো বাঙালির এই প্রাণস্পন্দন শুধুমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক এবং তা এই মহানগরীর ভেতরই সীমাবদ্ধ ছিল। এর সুফল সমগ্র বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়তে ঢের সময় লেগেছিল।
শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ড থেকে অনেক দূরে ছিলেন লালন (ছবি প্রতীকী); image source: lalongeeti.com

বাউলতত্ত্বের পটভূমিকা

কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণ সার্বজনীন মানবচেতনাকে অঙ্গীভূত করতে সক্ষম হয়নি। একদিকে বাঙালি মুলসলমানের রক্ষণশীল মনোভাব, আরেকদিকে জাতিগত স্বাতন্ত্র্য চিন্তার পরিপোষক বাঙালি হিন্দুর অবজ্ঞা ও ঔদাসীন্য এই নবজাগৃতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণে অন্তরায় হয়েছিল। এই নবজাগরণ বা রেনেসাঁ হিন্দু-মুসলিম মিলিত প্রয়াসের ফসল নয়, বরং তা উভয়ের মধ্যেকার ভেদনীতি ও বিদ্বেষকে ত্বরান্বিত করেছিল।
সকল কালেই একদল মানুষ শাস্ত্রাচারের গণ্ডীর বাইরে মানবমুক্তি ও ঈশ্বরলাভের পথ খুঁজেছেন। বিবাদ-বিভেদের পথে না গিয়ে তারা সমন্বয় ও মিলনের অভিনব বাণী প্রচার করেছেন। এমনই একজন হলেন লালন শাহ। মানুষকে সকল কিছুর উপরে স্থান দিয়ে তার দর্শন গঠন ও প্রচার করেছেন তিনি। লালন ছিলেন গ্রামের মানুষ, তার উপর গুহ্য সাধনকর্মে বিশ্বাসী নিরক্ষর বাউল। শিক্ষিত বাঙালির নবজাগৃতিমূলক কর্মকাণ্ডের খবর জানা বা এর সাথে পরিচিত হবার সুযোগ ও প্রয়োজন কোনোটাই তার ছিল না বললেই চলে। তবুও গ্রামীণ জীবনে নিজ সাধনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে যে তরঙ্গ তিনি তুলেছিলেন, তা বিস্ময়কর ও অসাধারণ।
নিগূঢ় ছিল তার দর্শন; image source: commons.wikimedia.org
বাউলমতের প্রবর্তনের পেছনে ধর্মজিজ্ঞাসা ও আধ্যাত্মজ্ঞান অন্বেষণের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, অবিচার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও জাতিভেদের মতো বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার অস্তিত্ব ছিল। সামাজিকভাবে বৈষম্যগ্রস্ত ও ধর্মীয় আচার বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি শাস্ত্রাচারহীন উদার ধর্মমত বা দর্শনের সন্ধান অতি স্বাভাবিক ছিল। লালনের জীবনের ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতাও এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। এক তীর্থযাত্রায় লালন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা পথিমধ্যেই তার সঙ্গ ত্যাগ করে। এক মুসলিম পরিবার তার সেবা-শুশ্রূষা করে সে যাত্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু বাড়ি তার আর ফেরা হয়নি। মুসলমানের অন্ন গ্রহণ করার কারণে নিজ গৃহে, হিন্দু সমাজে তার আর জায়গা হয়নি। স্বজন বিচ্ছিন্ন, ভগ্নহৃদয় লালন শেষে সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে এসে বাউলমতে দীক্ষা নেন।

লালনের মানবধর্ম

লালনের গানে ধর্ম সমন্বয়, আচারসর্বস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধতা, জাতিভেদ ও ছুঁৎমার্গের প্রতি ঘৃণা ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার বক্তব্যের সাথে তার আদর্শ ও জীবনাচরণের কোনো অমিল পাওয়া যায়নি। ফোঁটা, তিলক, টিকি-টুপি নিয়ে ধর্মের বাহ্যিক যে আচার, তার প্রতি লালনের কোনো আগ্রহই ছিল না। তিনি স্পষ্টই বলেছেন-
মাটির ঢিবি কাঠের ছবি
ভূত ভাবে সব দেবা-দেবী
ভোলে না সে এসব রূপি
ও যে মানুষ রতন চেনে।।
প্রাণহীন অসার বস্তু, অনৈসর্গিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তির তুলনায় মানবীয় কর্ম ও মহিমাকে বড় করে দেখিয়েছেন লালন। তার এই মানব মহিমা কীর্তন সেই যুগে দুর্লভ ছিল। নিচের এই গানটিতে লালন মানববন্দনার যে সুর তুলেছেন তার তুলনা গ্রাম্য সাহিত্যে তো নেই-ই, ভদ্র সাহিত্যেও বিরল-
অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি- মানবের উত্তম কিছুই নাই।
দেব-দেবতাগণ করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে।।
কত ভাগ্যের ফলে না জানি
মন রে পেয়েছো এই মানবতরণী
বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়
যেন ভারা না ডোবে।।
শ্রেণী-বর্ণবিভক্ত ধর্মীয় আচার-শাসিত সমাজে ছুঁৎমার্গ, অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ যে প্রবল সামাজিক ও মানবিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার বিরুদ্ধে লালন সবসময়ই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। ভেদনীতির বিরুদ্ধে সদর্পে তিনি বলেছেন-
জাত না গেলে পাই না হরি
কি ছার জাতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলিয়ে?
লালন কয় জাত হাতে পেলে
পুড়াতাম আগুন দিয়ে।।
মানুষই ছিল তার মূলতত্ত্ব; image source: pinterest.com
সেই সময় হিন্দু-মুসলিমের সামাজিক বিরোধ তো ছিলই, সাধনার পথে অগ্রসর হয়ে লালন দেখলেন এখানেও রয়েছে ভেদ-বিরোধ। সাধনার রীতিনীতি আর ফলাফল সবই বিভক্ত। বিরক্ত হয়ে লালন উভয় মতকেই খারিজ করে দিয়ে বললেন-
ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে?
আছে হিন্দু-মুসলমান দুই ভাগে।।
থাকে ভেস্তের আশায় মমিনগণ
হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন
ভেস্ত-স্বর্গ ফাটক সমান
কার বা তা ভালো লাগে।।
মানবগোষ্ঠী যে এক ও অখণ্ড, তারই আভাস দিয়েছেন লালন এই গানে। লালনের আচার-আচরণ ও কথাবার্তা দেখেশুনে সমকালীন মানুষ ধাঁধাঁয় পড়েছিল তার জাতিত্ব নিয়ে। জাতগর্বী সেই মানুষগুলোর কাছে জাতি পরিচয়ই ছিল মানুষের বড় পরিচয়। লালনও বহুবার নিজের জাত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। সাম্প্রদায়িক জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন-
কেউ মালা কেউ তসবি গলায়
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় কাররে।।
এই ছিল তার আজন্ম সাধনালব্ধ জ্ঞান; image source: tripadvisor.co.uk

রবীন্দ্রনাথের উপর লালনের প্রভাব

বাউল দর্শন ও সঙ্গীত বাংলার অনেক কৃতী মানুষদেরই আকৃষ্ট করেছে। তবে রবীন্দ্রনাথ বাউলদর্শনের উঠোনে বিচরণ করেননি শুধু, এর অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছেন। বাউল সংস্কৃতির প্রতি তার আন্তরিক অনুরাগের কথা বিভিন্ন সূত্রে নানাভাবে উচ্চারিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতায় বাউলের প্রসঙ্গ ও বাউল দর্শন নানাভাবে এসেছে। যেমন তার ‘অভিসার’ কবিতাটির কথাই ধরা যায়। “আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা!”-  প্রাণের গভীরে গিয়ে আঘাত করে সে কবিতার মর্মবাণী। আবার তার আত্মজৈবনিক কবিতাতেও বাউলচেতনার সাথে একাত্মতার পরিচয় ঘোষিত হয়েছে-
তরুণ যৌবনের বাউল
সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে
ডেকে বেড়ালে
নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে
অনির্দেশ্য বেদনার খেপা সুরে।
                             (পঁচিশে বৈশাখ)
লালনের ‘মনের মানুষ’কে রবীন্দ্রনাথ নিজেও খুঁজেছেন তার নিজের মনোভূবনে। ক্রমশ তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন ‘রবীন্দ্রবাউলে’। বাউল গানের সুর, বাণী ও তত্ত্বকথা তাকে যেমন আকৃষ্ট করেছে, তেমনি তিনি প্রভাবিত হয়েছেন বাউলের বেশভূষায়। বাউলের আলখাল্লা রবীন্দ্রনাথের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রমানসে বাউল প্রভাবের মূলে রয়েছে তার ব্যক্তিগত লালনচর্চা ও লালন শিষ্য সম্প্রদায়ের সাহচর্য।
রবীন্দ্রনাথ পরিণত হয়েছিলেন রবীন্দ্র বাউলে; image source: banglatribune.com
জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহ এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলতত্ত্বের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। তিনি লিখেছেন-
কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মানদীর ধারে,
যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙ্গে ফেলতে।
দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।
রবীন্দ্রনাথ প্রথম লালনের গানের উল্লেখ করেন প্রবাসী পত্রিকার ভাদ্র-১৩১৪ সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তার গোরা উপন্যাসে-
আলখাল্লা পরা এক বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল:
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।
একই গানের উদ্ধৃতি মেলে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থের 'গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ' অধ্যায়ে। উপরের দু’টি পঙক্তিই উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন-
“দেখিলাম, বাউলের গানেও ঠিক ঐ একই কথা বলিতেছে। মাঝে মাঝে বন্ধ খাঁচার মধ্যে আসিয়া অচিন পাখি বন্ধনহীন অচেনার কথা বলিয়া যায়; মন তাহাকে চিরন্তন করিয়া ধরিয়া রাখিতে চায়, কিন্তু পারে না। এই অচিন পাখির যাওয়া আসার খবর গানের সুর ছাড়া আর কে দিতে পারে!”
১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক ভাষণে লালনের ‘অচিন পাখি’ গানটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লালন ও শেলীর মধ্যে তুলনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। তিনি বলেছেন-
“…only Shelley’s utterance is for the cultural few, while the Baul Song is for the tillers of the soil, for the simple folk of our village households, who are never bored by the mystic transcendentalism.”
“এমন মানব জনম আর কি হবে
ও মন যা কর তা ত্বরায় কর এই ভবে।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দের প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লালনের উক্ত পঙ্কতিমালা উল্লেখ করে এর সমালোচনায় বলেন-
“এই ছন্দের ভঙ্গি একঘেয়ে নয়। ছোটবড় নানা ভাগে এঁকেবেঁকে চলেছে। সাধুপ্রসাধনে মেজেঘষে এর শোভা বাড়ানো চলে, আশা করি এমন কথা বলবার সাহস হবে না কারো।” 
লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। নিশ্চিত কোনো খবর এ বিষয়ে পাওয়া যায় না। তবে লালনের শিষ্যদের অনেকের সঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথের অনেকবার দেখা ও কথা হয়েছে, সে বিষয়ে অনেক ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি লালনের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। জানা যায়, ছেউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা আনিয়ে ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ২৯৮টি গান নকল করিয়ে নেন। এই খাতা সম্পর্কে সনৎকুমার মিত্র বলেছেন-
“...রবীন্দ্র ভবনের খাতা দুটিই ছেউড়িয়ার আশ্রমের আসল খাতা এবং যেভাবেই হোক তা রবিবাবুর হাতে পৌঁছানোর পর আর আখড়ায় ফিরে আসেনি।”
লালনগীতির সংগ্রাহক মতিলাল দাশকে লালন শিষ্য ভোলাই শাহ বলেছিলেন-
“দেখুন, রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালোবাসিতেন, আমাদের খাতা তিনি নিয়া গিয়াছেন, সে খাতা আর পাই নাই, কলিকাতা ও বোলপুরে চিঠি দিয়াও কোনো উত্তর পাই নাই।”
কবিগুরুর জগতে লালন যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা বুঝতে এর বেশি জানার প্রয়োজন পড়ে না।
লালনের গানের খাতাটি কবিগুরুর কাছেই রয়ে গিয়েছিল; image source: m.economictimes.com
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শক্তিমান, সচেতন ও অসামান্য এক শিল্পীপুরুষ। তাই তিনি লালনের বাণী ও সুরকে ভেঙে আপন মাধুরী দিয়ে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মরমী মানসে লালন ছিলেন প্রেরণার এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎস। রবীন্দ্রনাথ নিরক্ষর হলে হয়তো লালন ফকিরের মতো মরমী কবি হতেন, আর লালন শিক্ষিত হলে হয়তো হতেন রবীন্দ্রনাথের মতো বিদগ্ধ কবি। রবীন্দ্রমানসে লালনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে কালজয়ী এই দুই গীতি প্রতিভা সম্পর্কে এমনটা বলাই যায়। 

Monday, September 30, 2019

তৃতীয় বিশ্ব থেকে উঠে আসা প্রথম সুপারস্টার: বব মার্লে

বব মার্লে ছিলেন তৃতীয় বিশ্ব থেকে উঠে আসে প্রথম সুপারস্টার। ৭০ এর দশকে যিনি শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছিলেন তার নান্দনিক সুরের মূর্ছনায়। একাধারে তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী। তিনি গেয়েছেন এবং তৈরি করেছেন রেগি, স্কা, রক স্টেডি সহ নানা ধরনের মৌলিক এবং মিশ্র সঙ্গীত। বব মার্লে জ্যামাইকান সঙ্গীতকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, করে তুলেছেন জনপ্রিয়। মার্লের গানে এমন কিছু ছিল, যা শ্রোতাদেরকে তাদের দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দিয়ে সুরের তালে নেচে উঠতে বাধ্য করতো।

বব মার্লে © 103fm.tt

বব মার্লে ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ জ্যামাইকার নাইন মাইল নামক স্থানে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা নর্ভাল মার্লে ছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ জ্যামাইকান এবং মা সেডেলা বুকার ছিলেন আফ্রো-জ্যামাইকান। ববের পারিবারিক নাম রবার্ট নেসটা মার্লে। ১৯৫৫ সালে ববের যখন মাত্র দশ বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। তার পিতার মৃত্যুতে তাদের পরিবারের উপর অসহনীয় অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসে।
মার্লে এবং নেভিল লিভিংস্টোন (পরবর্তীতে যিনি বানি ওয়েইলার নামে পরিচিত হোন) ছিলেন ছোটবেলা থেকে বন্ধু। তারা প্রায়ই একসাথে গান-বাজনা করা শুরু করেন। বব মার্লে বারো বছর বয়সে তার মার সাথে নাইন মাইল ছেড়ে পাড়ি জমান ট্রেঞ্চটাউন, কিংস্টনে।
ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে বব ‘জাজ নট’, ‘ওয়ান কাপ অব কফি’, ‘ডু ইউ স্টিল লাভ মি?’ এবং ‘টেরর’ শিরোনামে চারটি গান রেকর্ড করেন ফেডারেল স্টুডিওজে। এর মধ্যে ‘ওয়ান কাপ অব কফি’ নামের গানটি মার্লে 'বব মার্টেল' ছদ্মনামে প্রকাশ করেন।
১৯৬৩ সালে বব মার্লে, বানি ওয়েইলার, পিটার টস, জুনিয়র ব্রেইথওয়াইটে, বেভারলি কেলসো, আর চেরি স্মিথ মিলে তৈরি করেন 'টিনেজারস' নামক একটি গানের দল যা পরে তারা বদলে নাম দেন 'ওয়েইলিং রুড বয়েজ' এরপরে আবার নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'ওয়েইলিং ওয়ারিয়রস'। তাদের এই গানের যাত্রায় একসময় সঙ্গীত প্রযোজক কক্সন ডোড তাদের আবিষ্কার করেন এবং এই দলের একটি একক গান ‘স্লিমার ডাউন’ জ্যামাইকার ১৯৬৪ সালে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত রেকর্ডের তালিকায় স্থান পায়। এই গানের রেকর্ডটি প্রায় ৭০,০০০ কপি বিক্রি হয় জ্যামাইকা জুড়ে।
Newsletter
Subscribe to our newsletter and stay updated.

বব মার্লে এসেক্স হাউজ, নিউ ইয়র্ক © Ebet Roberts

রপর জ্যামাইকান বিখ্যাত শিল্পী আর্নেস্ট রাংলিন, কিবোর্ডিস্ট জ্যাকি মিট্টো, সেক্সোফোনিস্ট রোনাল্ড আলফানসো সহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সাথে ববরা কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ব্রেইথওয়াইটে, কেলসো আর স্মিথ গানের দল ওয়ারিওরস ছেড়ে চলে গেলে বব, বানি আর পিটার এই তিনজন শুধু বাকি থাকেন দলে।
১৯৭২ সালে মার্লে সিবিএস রেকর্ডের সাথে যুক্ত হন এবং লন্ডনে জনি নাশ এর যাত্রা শুরু করেন। একই বছর ক্রিস ব্ল্যাকওয়েল ওয়েইলারসদেরকে তার আইসল্যান্ড রেকর্ডস এর সাথে কাজ করার প্রস্তাব দিলে মার্লেদের দল এতে রাজি হয় এবং প্রথম এ্যালবাম ‘ক্যাচ অ্যা ফায়ার’ ১৯৭৩ সালে বিশ্ব জুড়ে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালবামটি বব মার্লেকে স্টার বানাতে না পারলেও তার কাজের সীমাকে বিস্তৃত করে দেয়, কারণ তার কাজ নিয়ে তখন থেকে বিস্তর ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়। ওই বছরেরই শেষদিকে ‘বার্নিন’ শিরোনামে অ্যালবাম প্রকাশ পেলে তা মার্লেকে খ্যাতি এনে দেয়। ‘বার্নিন’ এর একটি গান ‘আই শট দ্য শেরিফ’ গানটির কভার করেন এরিক ক্ল্যাপটন। এই গানটাই ববের প্রথম ইউএস হিট হিসাবে গণ্য হয়। চারিদিকে বব মার্লের নাম ছড়িয়ে দিতে এই কভারটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৭৪ সালে 'দ্যা ওয়েইলারস' ব্যান্ড দল ভেঙে যায় এবং এর প্রধান তিন অংশীদার তাদের আলাদা আলাদা ক্যারিয়ার শুরু করেন।

বব মার্লে লন্ডনে © David Corio

১৯৭৬ সালে মার্লের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হয় এবং এ ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে সে বছরের শেষভাগে বব জ্যামাইকা ছাড়েন এবং বাহামায় একমাসের যাত্রাবিরতির পর লন্ডনে এসে পৌঁছান। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি ‘এক্সোডাস’ ও ‘কায়া’ শিরোনামে দুইটি এ্যালবাম প্রকাশ করেন। এরমধ্যে ‘এক্সোডাস’ ব্রিটিশ অ্যালবাম লিস্টে ধারাবাহিকভাবে ছাপ্পান্ন সপ্তাহ প্রথম অবস্থান ধরে রাখে। এই অ্যালবামে চারটি ব্রিটিশ সিঙ্গেল হিট ছিল। ‘ওয়েইটিং ইন ভেইন’, ‘জ্যামিং’, ‘ওয়ান লাভ’ এবং ‘পিপলস গেট রেডি’ নামক এই চারটি একক গান তৎকালীন ইউএস হিট লিস্ট লিড দেয়। লন্ডনে বব মার্লেকে একবার গাঁজা রাখার দায়ে গ্রেফতার এবং সাজা দেয়া হয়। তিনি লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটান দীর্ঘ দুই বছর।
অবশেষে, ১৯৭৮ সালে তিনি জ্যামাইকায় ফিরে আসেন এবং রাজনীতিকে ইতিবাচক দিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। তিনি ‘ওয়ান লাভ পিস কনসার্ট’ আয়োজন করেন, যেখানে জ্যামাইকার দুইটি লড়াইরত রাজনৈতিক পার্টির দুই প্রধানকে তিনি এক মঞ্চে নিয়ে আসেন। জ্যমাইকাসহ আফ্রিকানদের কল্যাণে তিনি চিন্তা করেছেন সবসময়।
১৯৬৬ সালে বব মার্লে বিয়ে করেন রিটা অ্যান্ডারসনকে। মূলত তখন থেকেই বব রাস্তাফারি বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি আস্তে আস্তে আনুষ্ঠানিকভাবে রাস্তাফারিজমকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন, এসময় তিনি তার চুলে রাস্তাফারি বিশ্বাস অনুযায়ী লম্বা জটাযুক্ত ঝুঁটি (Dreadlocks)করা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পুরোপুরি রাস্তাফারিয়ানে পরিণত হয়ে যান। তার প্যান আফ্রিকানিজম, রাজনৈতিক প্রগতিশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জীবনাচরণ সবই ছিল তার হৃদয়ের গভীরে ধারণ করা রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাসের থেকে উঠে আসা।

বব মার্লে এন্ড ওয়েইলারস © imgbin.com

মার্লে প্রচণ্ড রকম গাঁজায় আসক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যখন লোকজন গাঁজার ধোঁয়া টান দেয়। তখন তার মস্তিষ্ক কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,
“তুমি জানো? যখন আমরা ধূমপান করি, তখন সেটা আমাদের মাথা ঠাণ্ডা করে, শান্ত হয়ে বসে ধ্যান করতে সাহায্য করে। বোকা হয়ে বসে থাকার চেয়ে ধ্যান করে অন্য কেউ হয়ে যাও। রাম (মদ) শিক্ষা দেয় মাতাল হতে আর ঔষধি তৃণলতা (তিনি গাঁজাকে ঔষধি তৃণলতা বলতেন) নিজেকে অন্য কেউ ভাবতে সাহায্য করে”।

গাঁজায় ছিল ববের মারাত্মক আসক্তি © bobmarley.com

বব মার্লে ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। ইন্টারনেটে এখনও তার অসংখ্য ছবি আছে, যাতে তিনি ফুটবল খেলছেন। তার একটি উক্তি ছিল "ফুটবল স্বাধীনতা, একটি পুরো বিশ্ব। আমি এটা খেলতে ভালোবাসি কারণ ফুটবল খেলতে অনেক দক্ষ হতে হয়।" এটা খুব কম লোকই জানে যে, তিনি তার কন্ট্রাক্টে বলে দিতেন যে, তিনি যখনই চাইবেন তখনই যেন ফুটবল খেলা যায়, এরকম ব্যবস্থা রাখতে।
সালটা ছিল ১৯৭৭, তার পায়ের বুড়ো আঙুলের একটা ক্ষত কিছুতেই সারছিল না, তাই তিনি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেলে ধরা পড়ে- তিনি ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা অর্থাৎ সাধারণ ভাষায় চামড়ার ক্যান্সারে আক্রান্ত। ডাক্তাররা তাকে তার পায়ের আঙুল কেটে ফেলতে পরামর্শ দিলেও তিনি তা মেনে নেননি কারণ রাস্তাফারিয়ান বিশ্বাসে তা করার অনুমোদন নেই।
তার অসুস্থতার খবর সাধারণ মানুষকে জানতে না দিয়েই তিনি তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। ১৯৭৯ সালে একটি সফল ইউরোপ সফরের পরপরই জ্যামাইকায় তিনি প্রকাশ করেন ‘সারভাইভাল’ শিরোনামের একটি এ্যালবাম।
১৯৮০ সালে সফলতার চূড়ায় থাকা ওই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সফর শুরু করেন এবং ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি দু'টি শো করেন। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে জগিং করতে করতে পড়ে গেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার আগেই সনাক্ত হওয়া ক্যান্সার মস্তিষ্কসহ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি মিয়ামির একটি হাসপাতালে ১৯৮১ সালের ১১ই মে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
বব মার্লে ছিলেন আজীবন সংগ্রামী এক শিল্পী, জীবনঘনিষ্ঠ গান গাইতেন বলে তিনি পেয়েছেন আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা। মানবতার কথা, সামাজিক ন্যায় আর সুবিচারের কথা বলেছেন আজীবন। আজও তিনি সমান জনপ্রিয় তার আপন মহিমায়।

Saturday, September 28, 2019

"Cannabinoids May Be Useful in Treating The Side Effects of Cancer and Cancer Treatment" by U.S.A

Numerous people believe cannabis to be a successful cancer cure.  
By federal law, possessing cannabis (marijuana) is illegal in the United States unless it is used in approved research settings. Yet, a growing number of states, territories, and the District of Columbia have passed laws to legalize medical marijuana. 

Cannabis contains cannabinoids, also called phytocannabinoids, which cause drug-like effects in the body, including the central nervous system and the immune system.
The main psychoactive cannabinoid in Cannabis is delta-9-THC, while another active cannabinoid, cannabidiol (CBD), might alleviate pain and lower inflammation without causing the high of delta-9-THC.
The website of The National Cancer Institute, which is part of the US Department of Health, indicates that ‘cannabinoids may be useful in treating the side effects of cancer and cancer treatment’.
The website also adds that no ongoing studies of cannabis as a treatment for cancer in people have been found in the CAM on PubMed database maintained by the National Institutes of Health. Yet, small studies have been done, but their results have not been reported or suggest a need for larger studies.

Cannabis and cannabinoids have been studied as ways to manage side effects of cancer and cancer therapies, including pain, nausea, appetite loss, as well as pain, and anxiety.
The National Cancer Institute suggests that laboratory and animal studies have shown that cannabinoids may be able to kill cancer cells while protecting normal cells. They may inhibit tumor growth by causing cell death, inhibiting cell growth, and blocking the development of blood vessels needed by tumors to grow.
Yet, researchers added that at the time, there is a lack of evidence that recommends patients to inhale or ingest cannabis as a treatment for cancer-related symptoms or side effects of cancer therapy.
Cannabis has been commonly used by patients diseased with some type of cancer as a way to alleviate pain in numerous US states where it is legal for medicinal application. 
However, The Cancer Research Charity cautiously explains that there isn’t enough reliable evidence to prove that cannabinoids, whether natural or synthetic, can effectively treat cancer in patients, although research is ongoing around the world.
Therefore, even though cannabis and its derivatives may help to alleviate disease- and therapy-related symptoms, there is still no clinical evidence of its anti-cancer efficacy.


Medical marijuana can help with certain conditions, and research is ongoing into what kind of positive effects it can have on various diseases, including cancer.
 It has been recognized as one way of dealing with nausea caused by chemotherapy.
Also, one 2014 study on using cannabinoids and radiotherapy to tackle aggressive brain cancer has shown promising results, but we are still at the “inconclusive evidence” stage.
The FDA says that the claims that certain CBD-based products can kill off cancer cells or combat tumors in any way are simply unfounded, and companies should stop advertising them as anything close to being cures for cancer.
Yet, the FDA also points out that we still don’t know enough about cannabis, but the recent moves to legalize it urge scientists to gather detailed evidence about its effects on our body.
The agency also published a consumer update on its website to address some of the numerous claims surrounding this prevalent cannabinoid and attempts to dispel the notion that it is some kind of risk-free miracle drug. 
On the website, the FDA claims that it recognizes the significant public interest in cannabis and cannabis-derived compounds, particularly CBD, but there are many unanswered questions about the science, safety, and quality of products containing it. Therefore, they now work on answering them.
It adds that CBD products are still subject to the same laws and requirements as FDA-regulated products that contain any other substance. Moreover, the FDA explains that it has not approved the use of any other CBD product that the one prescription drug product used to treat rare, severe forms of epilepsy.